এখানে আপনি পাবেন বাংলা কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, গল্প, রচনা ও ব্যকরণ। Main Blog

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রচনা

 আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রচনা

জন্ম ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট
আবিষ্কার মার্কারি নাইট্রেট বা মারকিউরাস নাইট্রেট

ভূমিকা:

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ সবসময়ই হলো জ্ঞান চর্চা এবং বিশ্ববরেণ্য নানা প্রতিভার বিকাশ ভূমি। সেই সুদূর অতীতকাল থেকেই ভারতবর্ষ একের পর এক নানা যুগান্তকারী প্রতিভার জন্ম দিয়ে এসেছে। এই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেইসব প্রতিভা পৃথিবীর জন্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন এমন অমূল্য সব সম্পদ যা পৃথিবী কে বহুগুণে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত ভারতবর্ষে জ্ঞানচর্চার হৃদয় ছিল বাংলা।

বাঙালির শিরায় শিরায় তখন স্পন্দিত হত ভারতীয় ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার দ্যোতনা। সদ্য আধুনিক যুগে পদার্পণ করা ভারতবর্ষে এমনই জ্ঞানের দ্যোতনা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভারতীয় রসায়নের প্রাণপুরুষ, বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিক্ষক তথা কবি আচার্য শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তার সুমহান জীবনের পটচিত্রকে শব্দের আলোকপাত দ্বারা উদ্ভাসিত করার উদ্দেশ্যেই আমাদের আজকের এই প্রতিবেদনের উপস্থাপনা।


জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন:

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্ম ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট। অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামে বাংলার এই মহান প্রতিভাটি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হরিশচন্দ্র রায়চৌধুরী ছিলেন স্থানীয় জমিদার এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। তার অন্যান্য ভাই-বোনদের মধ্যে চার ভাই এবং দুই বোন।

প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পিতা একজন প্রজাহিতৈষী জমিদার ছিলেন। তিনি সানি ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্থাপন করেছিলেন স্কুল, সমাজ সংস্কারের জন্য যোগ দিয়েছিলেন ব্রাহ্মসমাজে। ছেলেবেলা থেকেই তাদের পরিবারে সংস্কৃতি এবং জ্ঞানচর্চার প্রচলন ছিল। এমন আবহেই বড় হয়ে উঠেছিলেন ভবিষ্যৎ ভারতের রসায়ন বিদ্যার জনক। তবে ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় পেটের অসুখ প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল।


শিক্ষাজীবন:

পৃথিবীর সকল বিশ্ববরেণ্য প্রতিভার শিক্ষাজীবনই পুঁথিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না বরং তা এইসব গণ্ডি অতিক্রম করে গেল রতনের আকর, পুস্তক ভান্ডারের দিকে এগিয়ে যায়। প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ছেলেবেলায় কলকাতার হেয়ার স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করলেও রক্ত আমাশয় রোগের কারণে তার পড়ালেখায় ব্যাপক ঘটে এবং অবশেষে তাকে গ্রামের বাড়ীতে ফিরে আসতে হয়।

সেখানে তিনি পিতার গ্রন্থাগারে অসংখ্য মূল্যবান বইয়ের নাকাল পান এবং সেগুলি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। এর দু’বছর পর প্রফুল্ল চন্দ্র কলকাতায় ফিরে আলবার্ট স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই তিনি স্কুল ফাইনাল তথা প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এখান থেকে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজ তার পরবর্তী শিক্ষাজীবন শুরু হয়।

এই কলেজ থেকে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এফ.এ পরীক্ষায় পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গিলক্রিস্ট বৃত্তি নিয়ে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।


কর্মজীবন:

পড়াশুনা শেষ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘোরাঘুরির পর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রফুল্ল চন্দ্র রায় দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে তার কর্মজীবন শুরু হয় প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি এই কলেজেই অধ্যাপনা করেছিলেন।

শিক্ষাজীবন চলাকালীন সময়ে আচার্য রায় রাসায়নিক গবেষণা ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তারই একান্ত উদ্যোগে উত্তর কলকাতার মানিকতলা অঞ্চলে তৈরি হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল।


বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অবদান:

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কর্মজীবনের আসল উপকথা লুকিয়ে আছে সমগ্র জীবনব্যাপী তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সমাজের প্রতি তাঁর অবদানের মধ্যে। সারা জীবন বিজ্ঞানের এই পুরোহিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সমাজসেবার উদ্দেশ্যে কাজ করে গিয়েছেন। জীবনে সর্বপ্রথম তার গবেষণার কাজ আরম্ভ হয় স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কপার ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণীর সম্মিলিত সংযুক্তি পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে।

দু’বছরের মধ্যে এই গবেষণার শেষ করে তিনি পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। এছাড়া পরবর্তীতে নিজের দেশের বাড়িতে ভেষজ নিয়ে গবেষণার মধ্যে দিয়ে তিনি তার ব্যক্তিগত গবেষণার কাজ আরম্ভ করেন। তার এই গবেষণাস্থল থেকেই বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা তৈরির চিন্তা উদ্ভূত হয়েছিল। এক্ষেত্রে একাধারে তিনি গবেষক এবং শিল্পোদ্যোগী দুয়ের ভূমিকাই পালন করেছিলেন।

১৮৯৫ সালে তিনি প্রথম আবিষ্কার করেন মার্কারি নাইট্রেট বা মারকিউরাস নাইট্রেট। তার এই আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি ছাড়া তিনি তাঁর সমগ্র জীবনে মোট 12 টি যৌগিক লবণ এবং পাঁচটি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানের পূজারী হওয়ার পাশাপাশি তার মনের শিল্পোদ্যোগ থেকে ১৯০৯ হালনাগাদ তার বাড়িতে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। 


ব্যক্তিগত জীবনে আচার্য:

ব্যক্তি হিসেবে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের চরিত্রে সমাহার ঘটেছিল একাধিক গুণাবলীর। জীবনের অনেকখানি সময় বিদেশে বিদেশী ভাষায় বিদ্যা চর্চার মধ্যে ব্যয় করলেও সারা জীবন তিনি ছিলেন বাংলা ভাষায় শিক্ষাদান বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার একজন প্রবল সমর্থক। অধ্যাপনা কালে তিনি তার সমস্ত ক্লাসের সকল ভাষণ বাংলায় দিতেন। বাংলা ভাষা আর বাংলার সংস্কৃতি আচার্য রায়ের রক্তের সঙ্গে মিশে ছিল।

সে কারণে তিনি ছাত্রদের মনও জয় করে নিতেন খুব সহজেই। তাছাড়া তার চরিত্রের মধ্যে ছিল অনাবিল দেশপ্রেম যা থাকে বিভিন্ন লোভনীয় সুযোগ ছেড়ে দেশে ফিরে অধ্যাপনায় প্রেরণা জুগিয়েছিল। এছাড়া জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার ঘোর বিরোধী ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিক্ষা স্থল থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে দূরীভূত করার জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছিলেন।


রচিত গ্রন্থাবলী:

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য বই এবং গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। তার প্রকাশিত মোট গবেষণাপত্রের সংখ্যা ১৪৫ টি। এছাড়া তাঁর রচিত বই গুলির মধ্যে ‘ইন্ডিয়া বিফোর আফটার সিপয় মিউটিনি’, সরল প্রাণিবিজ্ঞান: বাঙ্গালী মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার, হিন্দু রসায়ন বিদ্যা ইত্যাদি গ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে তাঁর রচিত প্রত্যেকটি বইয়ের মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসা, দেশের জন্য নতুন কিছু করার উদ্যোগ, এবং সর্বোপরি তার সরল মনের পরিচয় বিশেষভাবে পাওয়া যায়।


প্রাপ্ত পুরস্কার এবং সম্মাননা:

সমগ্র জীবন ব্যাপী তার অসংখ্য অবদান এবং কৃতিত্বের জন্য তিনি লাভ করেছেন বহু পুরস্কার এবং সম্মাননা। এগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আমরা তুলে ধরব। একজন সার্থক শিক্ষক হিসেবে তিনি সাধারণের মধ্যে পরিচিত ছিলেন আচার্য রায় হিসেবে। ১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তৃতীয় বারের জন্য আচার্য রায় ইংল্যান্ডে যান।

সেখানে তিনি সি.আই.ই সম্মান লাভ করেন। সেই একই বছরে ডারহাম ইউনিভার্সিটি তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দান করে। এছাড়া ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে মহীশূর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি ডক্টরেট পান। এগুলো ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় নাইট উপাধি লাভ করেন।


উপসংহার:

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন ভারতবর্ষের আকাশে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক স্বরূপ। ভারত মাতার কৃতি সন্তান আচার্য রায় সমগ্র জীবন দিয়ে দেশ এবং দেশের উন্নতির উদ্দেশ্যে কাজ করে গিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যাল বর্তমানে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছে।

করোনাকালে বেঙ্গল কেমিক্যাল-এর তৈরি হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ঔষধ সমগ্র বিশ্বের কাছে একটা সময় একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। এছাড়া এখানকার তৈরি ফিনাইল এবং ন্যাপথলিন সমগ্র দেশে জনপ্রিয়। এসবেরই সূত্রপাত হয়েছিল আচার্য রায়ের হাত ধরে। তাই সমগ্র দেশ কেন সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে আচার্য শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নাম সর্বদা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।